কিডনি রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার (ভিডিও সহ)

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় হলো কিডনি রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার। এছাড়াও এর কারণ ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হবে।

মরণ ব্যাধি নীরব ঘাতক অনেক গুলো রোগের মধ্যে কিডনি রোগ অন্যতম। ধিরে ধিরে ধ্বংসের মুখে ফেলে দেয়া কিডনি সংক্রান্ত রোগ গুলো এতোটাই ভয়াবহ হয়ে থাকে যে, কিডনি রোগের ফলে দেহের অন্য সকল অঙ্গ প্রত্যঙ্গের কার্যকারিতা একেবারেই কমিয়ে আনে। এই রোগের ছোয়া লাগলে জীবনে আনতে হয় বেশ পরিবর্তন। খাদ্যভ্যাস, জীবন-যাপন সহ প্রতিটা কার্যক্রমে প্রতিফলিত হয় এই রোগের ছোয়া।

এই আর্টিকেলে আপনাকে জানাবো ভয়াবহ নিরব ঘাতক কিডনি রোগ হওয়ার কারণ, লক্ষন, এবং প্রতিকারের জন্য করণীয় কাজ সমূহ সম্পর্কে। শুরু করা যাক কিডনি রোগের সম্পর্কে আরেকটু ব্যাসিক ধারণা প্রদানের মাধ্যমে।  

কিডনি রোগের ধারণা

কিডনি সংক্রান্ত রোগ মোট দুই ধরনের হয়ে থাকে। যার মধ্যে রয়েছে ৫ টি আলাদা আলাদা স্তর। প্রথম ৪ স্তরকে রাখা হয় এক ভাগে আর ৫ম ধাপকে রাখা হয় অন্য ভাগে। প্রথম ভাগের নাম দেয়া হয়েছে আকস্মিক কিডনি রোগ এবং ৫ম বা ফাইনাল স্তরকে বলা হয় দীর্ঘ মেয়াদী কিডনি রোগ।

কিডনি রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার
কিডনি রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার

কিডনির সমস্যা যদি প্রথম ৪ স্তরের মধ্যে থাকে তবে অনেক বেশি সম্ভাবনা রয়েছে কিডনি রোগের ভালো হওয়ার। কিন্তু ৫ম স্তরে পৌছে গেলে যেটা পুরোদমে কখনই ভালো হয় না। এক্ষেত্রে যদি ডায়ালাইসিস বা কিডনি স্থানন্তর না করা হয় সেক্ষেত্রে শরীরের অবনতির পাশাপাশি মৃত্যু অব্দি ঘটতে পারে ।

তবে কিডনি রোগ আগে থেকে শনাক্ত করা গেলে তার সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে ভালো করা সম্ভব। খুব সম্ভবত ৫-১০% কিডনি রোগিই ৫ম স্তর তথা দীর্ঘ কালীন কিডনি রোগে ভুগে থাকে। তবে খুব ভালো ব্যাপার এই যে, সঠিক পরিচর্চার মাধ্যমে কিডনি রোগ নিয়ন্ত্রনে রাখা সম্ভব।

কিডনি রোগ হওয়ার কারণ

কিডনি রোগ সম্পর্কে জানার আগে আমাদের আগে বুঝতে হবে কিডনি রোগের ব্যাপারটা কি? মূলত প্রস্রাবের রাস্তা সংক্রান্ত বিষয় নিয়েই কিডনির কাজ। তাই প্রস্রাবের রাস্তায় যেকোনো ধরনের সমস্যা হলেই সেটাকে কিডনি রোগের আওতায় নেয়া যায়।

সৌজন্যেঃ BBC NEWS বাংলা

কিডনি রোগ কেন হয় তা সম্পর্কে এখন অব্দি স্পেসিফিক কোনো কারণ জানে না কেউই, তবে কিছু কিছু বিষয়ের উপর দায়ভার চাপানো যায় কিডনি রোগের কারণ হিসেবে। যেগুলো হলো:

  • ডায়বেটিস থাকলে কিডনি আক্রান্ত হয়ে থাকে।
  • উচ্চ রক্তচাপের কারণে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে।
  • নেফ্রাটাইসিসের কারনেও কিডনি রোগের দেখা মিলে।
  • জন্মের সময় মা-বাবার কিডনি সমস্যা থাকলে সন্তানের হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
  • কিডনিতে পাথর জমাও অন্যতম কারন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
  • নিয়মিত ব্যায়াম বা কায়িক শ্রমের অভাবে কিডনিতে সমস্যা দেখা দেয়।
  • স্মোকিং বা ধুমপান অনেক বেশি দায়ী কিডনি রোগ হওয়ার জন্য।
  • অতিরিক্ত ও ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ঔষধ গ্রহণের কারনে কিডনি ড্যামেজ হয়।

তথ্যসূত্রঃ অধ্যাপক ডা. আছিয়া খানম

বিভাগীয় প্রধান, নেফ্রোলজি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
সৌজন্যেঃ NTV Health

কিডনি রোগের লক্ষণ সমূহ

সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার এই যে, প্রাথমিক পর্যায়ে কিডনি রোগের তেমন কোনো লক্ষন দেখাই যায় না বা বোঝা যায় না। যখন কিডনির কার্যক্ষমতা ধীরে ধীরে কমতে থাকবে তখনই কেবল ধীরে ধীরে লক্ষন গুলো চোখে পড়তে থাকবে। এই পর্যায়ে এমন বেশ কিছু লক্ষন সম্পর্কে জানাচ্ছি যা একজন কিডনি রোগীর মধ্যে লক্ষনীয় হয়ে থাকে।

১) এক্ষেত্রে সবার প্রথমে যে লক্ষনটার কথা জানানো হয় তা হলো প্রস্রাবের পরিবর্তন হওয়া। হয়তো প্রস্রাবের মাত্রা বেশ বেড়ে যাবে অথবা কমে যাবে। ব্যক্তি বিশেষে ভিন্নতা লক্ষ করা যায়। তাছাড়া প্রস্রাবের রঙ গাড় হওয়া এবং বেগ অনুভুতি হলেও প্রস্রাব না হওয়ার মত সমস্যার দেখা মিলে।

২) প্রস্রাবের সময় ব্যাথা অনুভুত হওয়ার পাশাপাশি প্রস্রাবের সাথে রক্ত ক্ষরণের মত ঘটনাও ঘটে থাকে। এবং এরুপ অবস্থায় দ্রুত চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করা উচিৎ।

৩) স্বাভাবিক ভাবে আমাদের দেহ শরীর থেকে লবণ ও পানি বের করে দেয়। কিন্তু যদি কিডনিতে সমস্যা হয় তখন এই কাজটি করা যায় না। তাই কিডনি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে পানি জমে যায়, বিশেষ করে পায়ে পানি জমে।

৪) যেহেতু কিডনি রক্ত তৈরি করার হরমোনের সাথে সরাসরি যুক্ত, তাই কিডনি রোগ হলে লোহিত রক্তকণিকা কমে যায়। যার ফলে মস্তিষ্কে অক্সিজেন পর্যাপ্ত পায় না এবং কোনো কাজে মনযোগ ধরে রাখতে অসুবিধা হয়।

৫) একই কারনে তীব্র শীত অনুভুত হয় এবং ত্বকে র‍্যাশ পড়ে যায়। যার ফলে শরীরের বিভিন্ন স্থানে চুলকানীর মত সমস্যা দেখা দেয়।

৬) বের হতে না পারা শরীরের ভেতরের বর্জ্য রক্তের সাথে মিলিত হলে ভেতর থেকে বমি বমি ভাব হয়ে থাকে। এবং ফুসফুসে তরল পদার্থ জমা হওয়া ও রক্তশূন্যতার কারনে শ্বাস জনিত সমস্যার দেখা মিলে।

৭) কোমরের দুই পাশে ব্যাথা অনুভব হওয়ার পাশাপাশি তলপেটে প্রচুর পরিমাণে ব্যাথা হয়ে থাকে।

উপরে উল্লেখিত লক্ষন গুলো সচারচর দেখা যায়। এছাড়াও আরো আরো অদেখা লক্ষনীয় বিষয় থাকতেই পারে। উপরে যে তথ্য গুলো প্রদান করা হলো সেগুলো স্বাস্থ্য সংক্রান্ত ওয়েবসাইট হেলথ ডাইজেস্ট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে।

সৌজন্যেঃ Doctorola TV

কিডনি রোগে খাবারে নিষেধাজ্ঞা

অনেক রোগের ক্ষেত্রেই খাওয়া দাওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা নিষেধাজ্ঞা থাকে। যে খাবার কিডনি রোগীদের জপ্ন্য নিষেধ করা হয়ে থাকে সেগুলো নিচে তুলে ধরা হলো।

ভিটামিন সি জাতীয় সকল খাবার থেকে বিরত থাকা উচিৎ। বলা হয়ে থাকে কামরাঙ্গা যদি এক গ্লাস ও কিডনি রোগে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তি খেয়ে থাকে তবে তার কিডনি নষ্ট হয়ে যাওয়া পর্যায় পর্যন্ত সমস্যা হতে পারে। উক্ত তথ্যটি জানিয়েছেন ডা. ফজল নাসের

এমনিতে যদি স্বাভাবিক মানুষ পরিমাণের বেশি ভিটামিন সি গ্রহন করে তবে তার সাপ্লিমেন্টরি কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত করতে থাকে। একদিনে সর্বোচ্চ ৮০-৯০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি খাওয়া উচিৎ যা একটি কমলা খাওয়ার সমান।

ভিটামিন সি ছাড়াও লবনাক্ত খাবার, স্মোকিং ও অ্যালকোহল গ্রহনের ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

আরো পড়ুনঃ টেস্টোস্টেরন হরমোন বৃদ্ধির উপায়

কিডনি রোগের প্রতিকারে করনীয় কাজ

যাদের ডায়াবেটিস রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে অবশ্যই কিডনির সমস্যা দেখা দিবেই, সেটা হোক ১০ থেকে ১৫ বছরের পর বা ২০ বছরের পর। এমনকি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রনে থাকলেও ৪০% সম্ভাবনা রয়েছে কিডনি ড্যামেজ হওয়ার।

হাই ব্লাড প্রেসারের সাথে কিডনি রোগের সম্পর্ক
হাই ব্লাড প্রেসারের সাথে কিডনি রোগের সম্পর্ক

তবে ভালো খবর এই যে, যথা সময়ে চিকিৎসা নিলে ৯০ – ৯৫% সম্ভাবনা রয়েছে এটা ভালো হয়ে যাওয়ার। কিডনি রোগ থেকে বাচতে করনীয় কিছু কাজ হলো:  

  • সর্বদা ডায়বিটিস এবং উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রনে রাখতে হবে।
  • নিয়মিত পরিক্ষা করতে হবে। কারন কিডনি রোগ হওয়া মাত্রই লক্ষন প্রকাশ হয় না।
  • অতিমাত্রায় এন্টিবায়োটিক ও ব্যাথার ঔষধ খাওয়া বন্ধ করতে হবে।
  • যখন প্রথম স্তরে থাকে তখন থেকেই চিকিৎসা শুরু করতে হবে।
  • জমা পাথর যাতে ব্লক করতে না পারে সে বিষয়ে চিকিৎসা করাতে হবে।
  • ডায়রিয়া, বমি, প্রস্রাবে রক্তক্ষরণ হলে দ্রুত চিকিৎসকের সরাপন্ন হতে হবে।
  • প্রস্রাবের ইনফেকশন রক্তে ছড়িয়ে যেনো না যায় সেই বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে এবং ইনফেকশনকে নিয়ন্ত্রণে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।

কিডনি রোগ বিষয়ক বিভিন্ন প্রশ্নোত্তর

কিডনি কত পয়েন্ট এবং কিডনির পয়েন্ট কত হলে ভালো?

পুরুষের ক্ষেত্রে প্রতি ডেসিলিটার রক্তে ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা ০.৬ থেকে ১.২ অব্দি থাকা ভালো এবং নারীর ক্ষেত্রে প্রতি ডেসিলিটার রক্তে ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা ০.৫ থেকে ১.১ অব্দি থাকা ভালো। তাছাড়াঃ

  • যাদের একটা কিডনি তাদের – ১.৮ মিলিগ্রাম
  • কিশোরদের ক্ষেত্রে তা – ০.৫-১.০ মিলিগ্রাম
  • শিশুদের ক্ষেত্রে – ০.৩-০.৭ মিলিগ্রাম

এবার আপনার বয়স অনুযায়ী দেখে নিন আপনার জন্য কতটুকু পয়েন্টে থাকা ভালো হবে।

কিডনির ব্যথা কোথায় হয়?

মেরুদন্ড থেকে একটু ডান পাশে অথবা দাম পাশের দিকে কিডনির ব্যাথা অনুভূত হয়। এক্ষেত্রে লক্ষনীয় রয়েছে যে, কিডনির ব্যাথাটা নড়াচড়া করতে থাকে। মানে একবার এদিক তারপর সময়েই অন্যদিকে ব্যাথা মুভমেন্ট করতে থাকে। যার ফলে শুয়ে থাকা, বসে থাকার ক্ষেত্রে শান্তি মিলে না।

আর্টিকেল শেষে কিছু কথা

পরিশেষে এই ছিলো কিডনি রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার বিষয়ক ব্যাসিক তথ্যের পেক্ষিতে সাজানো আর্টিকেল। যেখানে জানানো হয়েছে কিডনি রোগ সংক্রান্ত ব্যাসিক তথ্য, লক্ষন, হওয়ার কারন, প্রতিকারের উপায় এবং সবশেষে কিছু প্রশ্নের উত্তরের মাধ্যেম অতি গুরুত্বপূর্ণ আর্টিকেলের সমাপ্তি ঘটানো হয়েছে।

আমাদের পোস্টে সাধারণ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। তাই এটি বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার আগে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অবশ্যই নিবেন। সচেতন থাকুন, নিজেকে সুস্থ রাখুন, ধন্যবাদ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Scroll to Top